রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির উপায় ! সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ভাবে
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির উপায় খুঁজছেন? তাহলে আপনি সঠিক জায়গাতে আছেন। বর্তমান উন্নত প্রযুক্তির দুনিয়াতে আমরা প্রকৃতি থেকে অনেক দূরে সরে গেছি। যার জন্য আমাদের শরীরে অনেক জটিল রোগ বাসা বেধেছে। এই রোগ সারানোর জন্য আমরা দেশ-বিদেশ বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা নিয়ে থাকি।
কিন্তু আমরা হয়তো অনেকেই জানিনা আমাদের প্রকৃতির মাঝেই আমাদের এই সমস্ত জটিল
রোগের অনেক পথ্য লুকিয়ে আছে। শুধু ঔষধ দিয়েই নয় প্রাকৃতিক ভাবেও
অনেক জটিল রোগকে হারিয়ে সুস্থ থাকা যায়। আজ আমরা সে বিষয়গুলো নিয়ে
আলোচনা করব। কি কি পদ্ধতি অবলম্বন করলে এই ফরমালিনের যুগেও প্রাকৃতিকভাবে
সুস্থ থাকা যায়।
পেজ সুচিপত্রঃ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির উপায়
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির উপায়
- আম পাতার বিস্ময়কর ক্ষমতা ও ব্যবহার
- ক্ষত নিরাময়ে প্রকৃতির প্রাথমিক চিকিৎসা
- মৌসুমি ব্যাধি: চিকেন পক্স ও হামের ভেষজ সমাধান
- সর্দি ও ঠান্ডায় ঘরোয়া রান্নার জাদুকরী প্রভাব
- প্রসূতি মা ও নতুন জীবনের সুরক্ষা: কালোজিরা
- জ্বর ও অরুচি নিরাময়ে রসুনের ব্যবহার
- হলুদ: গোল্ডেন হার্ব বা প্রকৃতির নিজস্ব অ্যান্টিবায়োটিক
- লিভারের সুরক্ষা ও হজম শক্তিতে তিতা খাবারের গুরুত্ব
- ফল খাওয়ার নিয়ম ও সতর্কতা
- ভবিষ্যতের জন্য অর্গানিক চেইন ও বাগান
- শেষ কথাঃ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির উপায়
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির উপায়
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের এত উন্নতির মাঝেও আজ মানুষ নানান রকম জটিল জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। জীবনযাত্রার পরিবর্তন, খাবারের ভেজাল এবং অতিরিক্ত ওষুধ খাওয়ার কারণে বা অতিরিক্ত ওষুধের ওপর আমাদের জীবনটা নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। যার কারণে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দিন দিন কমে যাচ্ছে। অথচ আমাদের পূর্বপুরুষেরা শত বছর পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। আর এটা সম্ভব হতো শুধুমাত্র তারা প্রকৃতির উপর নির্ভর করে জীবন যাপন করতেন বলেই। আমাদের আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এমন অনেক গাছপালা এবং ঘরোয়া সমাধান যা কোন রকমের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই বড় বড় রোগ শারিয়ে তুলতে পারে এবং আমাদেরকে সুস্থ রাখতে পারে।
আরো পড়ুনঃ প্রতিদিনের জীবনকে সহজ ও আনন্দময় করার ১০টি উপায়
উন্নত চিকিৎসা বিজ্ঞানের যুগে আমাদের সামান্য কিছু রোগ হলেই অনেক দামি দামি ওষুধ
এবং দেশ-বিদেশের চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। অথচ আমরা অনেকে জানি না
যে শুধু ঔষধ নয় প্রকৃতিতেও আমাদের রোগ নিরাময়ের অনেক উপাদান লুকিয়ে
আছে। অথচ আমরা আমাদের জীবনটাকে ঔষধের উপর নির্ভরশীল করে ফেলেছি। আমরা চাইলেই
আমাদের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় এবং জীবনযাত্রায় সামান্য কিছু পরিবর্তন এনেই
আমাদের ঔষধের বাক্সকে চির বিদায় জানাতে পারি। আজকে আমরা এমন কিছু বিষয় নিয়ে
আলোচনা করব যা আমাদেরকে প্রাকৃতিকভাবে সুস্থ রাখতে সাহায্য করবে।
আম পাতার বিস্ময়কর ক্ষমতা ও ব্যবহার
আমরা আমাকে ফলের রাজা হিসেবেই জানি, কিন্তু আমরা অনেকেই এটা জানিনা যে আমের
কচি পাতা ভেষজ চিকিৎসায় এক অমূল্য সম্পদ। আমাদের দেশের শহরের,
গ্রামের রাস্তাঘাটে বা বাড়ির আঙিনায় আমের গাছ নেই এমন জায়গা খুব কমই
আছে। কিন্তু আমের কচি পাতার সঠিক ব্যবহার আমাদের শরীরের ভেতরের বিষাক্ত
উপাদান গুলো বের করে দিবে দারুণভাবে কাজ করে। নিয়মিত কচি আম পাতার রস সেবন
করলে শরীরের কোষ গুলো সতেজ হয়, যা মূলত প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির উপায়
হিসেবে প্রাচীনকাল থেকেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এটি শরীরের পরিপাকতন্ত্রকে ভেতর
থেকে ডিটক্সিফাই বা বিষমুক্ত করে রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়াকে শতভাগ সচল রাখতে
সাহায্য করে। ক্ষতিকর ফ্রি-র্যাডিক্যালের বিরুদ্ধে লড়াই করে এটি আমাদের লিভার ও
কিডনির কার্যক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, যার ফলে শরীর প্রাকৃতিকভাবেই সুস্থ ও
প্রাণবন্ত থাকে। আমের কচি পাতার চমৎকার কিছু ভেষজ ব্যবহার নিয়ে সংক্ষেপে কিছু
আলোচনা করা হলো।
কৃমি দমনে ঘরোয়া সমাধান
কৃমি আমাদের মানব শরীরের জন্য অনেক ভয়ংকর একটা অসুখ। এটা বড়দের সাথে সাথে ছোট বাচ্চাদের ও স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এ সমস্যা দূর করার জন্য আমের লালচে বা হালকা সবুজ রঙের কচি পাতাগুলো তুলে নিন গরম ভাতের উপর এই পাতাগুলো কিছুক্ষণ রেখে দিলে তা ভাপে নরম হয়ে যাবে। এরপর সামান্য লবণ দিয়ে মেখে ভাতের সাথে প্রথম লোকমাতে একটু খেয়ে নিন। এটি পেটের ভেতরের ক্ষতিকর পরজীবী বা কৃমি ধ্বংস করতে জাদুর মত কাজ করে এবং নিয়মিত খেলে আমাদের হজম শক্তি দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। পরিষ্কার থাকলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এমনিতেই অনেক বেড়ে যায়। এটি লিভারের ফ্যাট জমতে বাধা দেয় এবং রক্তের ব্যাড কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে হার্টকে সুরক্ষিত রাখে। প্রাকৃতিকভাবে রক্তনালী পরিষ্কার রাখার কারণে এটি দীর্ঘমেয়াদে স্ট্রোক ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমাতেও দারুণ সাহায্য করে।
রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে
আম পাতায় প্রচুর পরিমাণে "অ্যান্থোসায়ানিডিন" রয়েছে, যা উচ্চ রক্তচাপ কমাতে দারুনভাবে সাহায্য করে। কচি পাতা শুকিয়ে গুড়ো করে পানিতে ভিজিয়ে রাখলে বা কচি পাতার চা বানিয়ে পান করলে রক্তনালী গুলো শিথিল হয়। এছাড়া ডায়াবেটিস রোগীর জন্য কচি আম পাতা সেদ্ধ পানি সকালে খালি পেটে পান করা রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণের একটি অত্যন্ত প্রাচীন এবং কার্যকরী পদ্ধতি। রক্তে সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ রাখাও প্রাকৃতিক উপায়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির উপায় গুলোর মধ্যে অন্যতম। কচি আম পাতায় থাকা 'ট্যানিন' এবং 'ম্যাঙ্গিফেরিন' নামক উপাদানগুলো ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়িয়ে অগ্ন্যাশয় বা প্যানক্রিয়াসকে সুস্থ রাখে। নিয়মিত এই প্রাকৃতিক পানীয় পানের অভ্যাস শরীরের মেটাবলিজম বাড়িয়ে বাড়তি মেদ কমাতেও এক জাদুকরী ভূমিকা পালন করে।
ক্ষত নিরাময়ে প্রকৃতির প্রাথমিক চিকিৎসা
গাঁদা ফুলের পাতার রস
গাঁদা ফুলের পাতা থেঁতলে তার রস কাটা বা ক্ষতস্থানে সরাসরি লাগিয়ে দিন। এটি প্রাকৃতিকভাবে রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করে এবং ক্ষতস্থানকে খুব দ্রুত জীবাণুমুক্ত রাখতে সাহায্য করে। এমনকি পুরনো ঘা বা যে কোন চর্ম রোগের স্থানেও গাঁদা পাতার পেস্ট নিয়মিত লাগালে দ্রুত সুফল পাওয়া যায় এই পাতার অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল উপাদান ক্ষতস্থান কে পচন থেকে রক্ষা করে এবং দ্রুত চামড়া শুকাতে সাহায্য করে। এছাড়াও দুর্বাঘাস থেতলে সেটাও যদি ক্ষতস্থানে লাগানো হয় খুব দ্রুত রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে যায়। প্রকৃতির এই সহজলভ্য উপাদান দুটি কাটা জায়গার কোষগুলোকে দ্রুত জোড়া লাগাতে এবং ত্বকের ওপর নতুন চামড়া তৈরিতে জাদুর মতো কাজ করে। কোনো রকমের কেমিক্যালযুক্ত অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম ছাড়াই এগুলো ক্ষতস্থানের জ্বালাপোড়া কমিয়ে ইনফেকশনের ঝুঁকি একেবারে দূর করে দেয়।
আসন পাতার ব্যবহার
আসন পাতা বা পাথরকুচি পাতা ভেষজ উপাদান গুলো রক্তপাত বন্ধ করার জন্য অত্যন্ত বিখ্যাত। বিশেষ করে যারা গ্রামে বাস করেন, তারা জানেন গভীর কোন ক্ষতস্থানে এই পাতার রস দিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিলে সে ক্ষতস্থান কত দ্রুত শুকিয়ে যায়। আমাদের উচিত এ ধরনের ঔষধি গাছগুলো প্রকৃতি থেকে বিলুপ্ত হতে না দিয়ে, আমাদের বাসা বাড়ির আঙিনায় বা টবে সংরক্ষণ করা। প্রাকৃতিক পাতাগুলোর সঠিক ব্যবহার জানা থাকলে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য ওষুধের উপর নির্ভর করতে হয় না।বিশেষ করে পাথরকুচি পাতার রস শুধু ক্ষতস্থানই শুকায় না, বরং এটি নিয়মিত সেবনে কিডনির পাথর গলাতেও এক অনন্য ভূমিকা পালন করে। বাড়ির ছোট বাচ্চাদের হঠাৎ যেকোনো সাধারণ শারীরিক অসুস্থতায় এই পাতাগুলো ঘরে থাকা মানেই একটি প্রাকৃতিক ফার্স্ট এইড বক্সের মতো কাজ করা।
মৌসুমি ব্যাধি: চিকেন পক্স ও হামের ভেষজ সমাধান
বসন্তকালে বা ঋতু পরিবর্তনের সময় আমাদের দেশে চিকেন পক্স ও হামের প্রাদুর্ভাব প্রকট আকারে দেখা যায়। এ সময় আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে প্রচন্ড জ্বালাপোড়া চুলকানি ও তীব্র শরীর ব্যথা হয়। এ অবস্থায় রাসায়নিক ওষুধের পাশাপাশি কিছু ঘরোয়া ভেষজউপাদান রোগীকে দ্রুত আরাম দিতে পারে এবং ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে। এ ধরনের ছোঁয়াচে রোগ থেকে বাঁচতে হলে শরীরের ভেতরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী হওয়া জরুরি, আর প্রাকৃতিক উপাদানই হলো ভাইরাসের বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির উপায়। প্রকৃতির এসব ভেষজ উপাদান কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই ভাইরাসের আক্রমণকে দুর্বল করে দেয় এবং শরীরের কোষে নতুন শক্তি জোগায়। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক দুর্বলতা বা ত্বকের জেদি দাগের হাত থেকে সহজেই রক্ষা পেয়ে দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন।
কাটা মারিষের শিকড়
গ্রামেগঞ্জে বা শহরেও আমাদের দাদী-নানী রা পক্স বা হাম হলে কাটা মারিসের শেকড়ের রস খাওয়ার পরামর্শ দিতেন। এটি স্বাদে বেশ তিতা হলেও শরীরের ভেতরের বিষাক্ত টক্সিন বের করে দিতে দারুণ সাহায্য করে দৈনিক হাফ কাপের চেয়েও কম পরিমাণে রস খেলে হাড়ের ভেতরের কামরানি এবং রোগের স্থায়িত্ব অনেকটাই কমে যায়। এই তিতা রসটি শরীরের শ্বেত রক্তকণিকা বাড়াতে সাহায্য করে যা সরাসরি ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। এছাড়াও এটি পক্সের কারণে হওয়া তীব্র জ্বরের তাপমাত্রা দ্রুত কমিয়ে শরীরকে ভেতর থেকে শীতল ও শান্ত রাখতে সাহায্য করে। এটি রক্তের দূষিত উপাদানগুলোকে ছেঁকে বের করে দেয় বলে পক্সের গুটিগুলো দ্রুত শুকিয়ে চামড়া তার স্বাভাবিক ও মসৃণ ভাব ফিরে পায়।
নিম পাতার ব্যবহার
সর্দি ও ঠান্ডায় ঘরোয়া রান্নার জাদুকরী প্রভাব
ঋতু পরিবর্তন বা বর্ষাকাল ও শীতকালে সর্দি কাশি আমাদের প্রায় প্রত্যেকেরই নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়।সামান্য ঠান্ডাতে ইনহেলার বা কফ সিরাপ এর বোতল না খুলে রান্নাঘরের কিছু মসলাই হতে পারে এর সেরা সমাধান। আমাদের রান্নাঘরে থাকা সাধারণ কিছু উপাদান ফুসফুসকে সতেজ রাখতে সাহায্য করে।ফুসফুস এবং শ্বাসনালী কে ইনফেকশন মুক্ত রাখাই হলো ঠান্ডা জনিত সমস্যায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির উপায়। মসলাগুলো খেলে বারবার ঠান্ডা লাগার প্রবণতা চিরতরে দূর হয়ে যায়। বিশেষ করে আদা, দারুচিনি, লবঙ্গ বা গোলমরিচের মতো অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ উপাদানগুলো আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ কোষগুলোকে সক্রিয় করে তোলে। এগুলো শ্বাসনালীর ভেতরের ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের সংক্রমণ রুখে দিয়ে ফুসফুসকে যেকোনো তীব্র অ্যালার্জি বা ইনফেকশন থেকে দীর্ঘমেয়াদে সুরক্ষিত রাখে।
রাই সরিষার ঝাঁঝালো চিকিৎসা
সর্দি যখন বুকে বসে যায় বা নাক বন্ধ হয়ে যায়, , তখন রায় সরিষা, কাঁচা
মরিচ আর লবণ দিয়ে ভালো করে বেটে নিন। এই ঝাঁঝালো সরিষা বাটা দিয়ে গরম ভাত
মেখে খেলে আপনার বন্ধন আগ মুহূর্তেই খুলে যাবে। চোখের পানি ও নাকের পানির
মাধ্যমে সাইনাসের ভেতরের জমে থাকা সমস্ত ময়লা বের হয়ে আসবে এবং সর্দির সময়
মুখের বন্ধ রুচি ফেরাতেও এটি ধারণ কার্যকর। এই ঝাঁঝালো রসটি শ্বাসনালীর
ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া গুলোকে নিমেষেই ধ্বংস করে ফেলে। এর তীব্র ঝাঁঝ বুকে
জমে থাকা শক্ত কফকে নরম করে সহজেই বের করে দিতে সাহায্য করে, যার ফলে ফুসফুস
হালকা হয় ও শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক হয়ে আসে। তীব্র ইনহেলার বা কড়া কফ সিরাপের
ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই এটি সাইনাসের ব্লকেজ কাটাতে এক জাদুকরী ঘরোয়া
সমাধান হিসেবে কাজ করে।
সরিষার তেলের মালিশ
ছোট বাচ্চাদের বুকে ও পিঠে খাঁটি সরিষার তেলের মালিশ ঠান্ডার দিনে অনেক আরাম দেয়। এই তেলের সাথে সামান্য রসুন ও কালোজিরা ফুটিয়ে হালকা গরম অবস্থায় মালিশ করলে ঠান্ডার হাত থেকে দ্রুত নিরাময় পাওয়া যায়। এটি শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে এবং কাশির তীব্রতা কমায়।শীতকালে নিয়মিত এই তেলের মালিশ বাচ্চার শরীরের চামড়া কে সুরক্ষিত রাখে এবং ঠান্ডা লাগার বিরুদ্ধে একপ্রকার ঢাল হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর আগে বাচ্চার পায়ের তালুতে এই তেল হালকা মালিশ করে দিলে বন্ধ নাক নিমেষেই খুলে যায় এবং বাচ্চা শান্তিতে ঘুমাতে পারে। এটি ফুসফুসের রক্ত সঞ্চালন বাড়িয়ে বুক থেকে জমা কফ তরল করে বের করে দিতেও দারুণ সাহায্য করে।
প্রসূতি মা ও নতুন জীবনের সুরক্ষা: কালোজিরা
বাড়িতে সন্তান জন্মের পর নতুন মায়েদের স্বাস্থ্যের বিশেষ যত্ন এবং পুষ্টিকর খাবারের প্রয়োজন হয়। এই সময় শরীরের হাড় মজবুত করা এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোই প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। আর এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কালোজিরা একটি জাদু করে ভূমিকা পালন করতে পারে। নতুন মায়েদের জন্য কালোজিরা খাওয়া হলো প্রাকৃতিকভাবে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির উপায়, যা মা ও সন্তান উভয়কে সুস্থ রাখে। এটি মায়ের বুকের দুধের মাধ্যমে শিশুর শরীরেও পুষ্টি জোগাতে সাহায্য করে, ফলে নবজাতকের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রাকৃতিকভাবেই শক্তিশালী হয়ে ওঠে। প্রসব-পরবর্তী সময়ে মায়েদের শারীরিক দুর্বলতা কাটিয়ে দ্রুত কর্মক্ষমতা ফিরে পেতে এই ঘরোয়া উপাদানটি দারুণ কার্যকরী।
কালোজিরা: সকল রোগের মহৌষধ
হাদিসে কালোজিরা খেয়ে মৃত্যু বাদে সকল রোগের মহা ঔষধ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। বিশেষ করে নতুন মায়েদের পেটের মেদ কমাতে এবং বুকের দুধের প্রবাহ বৃদ্ধি করতে কালোজিরা ভর্তার কোন বিকল্প নেই। এটি শরীরে তাৎক্ষণিক শক্তি যোগায় এবং প্রসূতি মায়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য দ্রুত সাহায্য করে। নিয়মিত কালোজিরার সেবন করলে শরীরের ভেতরের যেকোনো লুকানো ইনফেকশন খুব দ্রুত সেরে যায়। এতে থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও আয়রন নতুন মায়েদের শরীরের রক্তশূন্যতা দূর করতে এবং প্রসব পরবর্তী ধকল কাটিয়ে উঠতে দারুণ ভূমিকা রাখে। এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে এতটা শক্তিশালী করে তোলে যে ঋতু পরিবর্তনের সাধারণ রোগবালাই সহজে আক্রমণ করতে পারে না। তাই প্রসূতি মায়েদের দ্রুত শারীরিক সুস্থতা ও দীর্ঘস্থায়ী এনার্জি ধরে রাখতে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় কালোজিরা রাখা অত্যন্ত জরুরি।
আরো পড়ুনঃ হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ! বাঙালি সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহ্য গুলো
সামান্য কিছু তেলে কালোজিরা নিন, তবে এটি বেশি ভাজবেন না কারণ বেশি ভাজলে এটি তিতা হয়ে যাবে। এরপর এটি পিছে কাচের বয়ানে সংরক্ষণ করুন এবং ভাতে সামান্য পেঁয়াজকুচি কাঁচা মরিচ আর লবণ দিয়ে কালোজিরা মেখে খেয়ে দেখুন। এর স্বাদ যেমন অসাধারণ গুনাগুনও তেমনি অবিশ্বাস্য। কালোজিরা ভর্তায় সরিষার তেল বা রসুন না দেওয়ায় উত্তম। এছাড়াও কালোজিরা আরো অনেকভাবেই আমরা খেতে পারি। সকালে হাতের তালুতে একটু মধু নিয়ে সেই মধুর উপরে সামান্য কালোজিরা দিয়ে চেটে খেতে হবে এতে করে পেটের অনেক সমস্যা দূর হয়ে যায়। এই সহজ ভর্তাটি শরীরের রক্তকণিকা সচল রাখতে এবং মেটাবলিজম বাড়াতে দারুন সাহায্য করে
জ্বর ও অরুচি নিরাময়ে রসুনের ব্যবহার
জ্বর হলে আমাদের জিভ তেতো হয়ে যায় এবং কোন খাবার খেতে ভালো লাগে না। এ
অবস্থায় রসুনের শক্তিশালী ভেষজ গুণ শরীরকে চাঙ্গা করে তুলতে পারে। রসুন
আমাদের শরীরের শ্বেত রক্তকণিকা বাড়িয়ে ভেতরের ইনফেকশনের বিরুদ্ধে লড়াই
করে। তাই জ্বরের সময় রসুনের সঠিক ব্যবহার জানা অত্যন্ত জরুরি একটি রোগ
প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির উপায়। নিয়মিত রসুন সেবন করলে এটি শরীরের রক্ত
সঞ্চালন সচল রাখে এবং ক্ষতিকর টক্সিন শরীর থেকে ঘামের মাধ্যমে বের করে দেয় ফলে
ঝিমিয়ে পড়া শরীর খুব দ্রুত তার স্বাভাবিক শক্তি ও রোগমুক্ত কর্মক্ষমতা ফিরে
পায়।
পোড়ানো রসুনের ভর্তা
চিকিৎসা জগতে রসুন একটি প্রাকৃতিক এন্টিবায়োটিক হিসেবে অত্যন্ত
পরিচিত। কিন্তু আমরা অনেকেই শুধুমাত্র তরকারিতে রসুনের বাটা মসলা ছাড়া
অন্যভাবে রসুন খাওয়া জানিনা। জ্বরের রোগীকে মুখের রুচি ফেরানোর জন্য রসুন
পরিয়ে নিয়ে সরিষার তেল, শুকনা মরিচ আর লবণ দিয়ে ভর্তা করে দিন। রসুন
শরীরের রক্ত সঞ্চালন বাড়ায় এবং শরীর থেকে ঘামের মাধ্যমে অতিরিক্ত তাপমাত্রা বের
করে দিয়ে জ্বর কমায়। থাকা এলিসিন নামক উপাদানটি শরীরের ভেতরের ক্ষতিকর
জীবনকে ধ্বংস করে দ্রুত সুস্থ করে তোলে। এছাড়াও এই পোড়ানোর রসুনের ভর্তা
মুখের স্বাদ ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি বুকের ভেতরের জমে থাকা পুরনো কফ গলিয়ে বের
করতেও সাহায্য করে।
কাঁচা রসুনের পানি
রাতে ঘুমানোর আগে এক কোয়া রসুন, কুচি করে পানি দিয়ে গিলে ফেললে
হৃদরোগের ঝুঁকি অনেক অংশ কমে যায় এটি প্রাকৃতিকভাবে শরীরের রক্তকে পাতলা রাখতে
সাহায্য করে এবং ক্ষতিকর কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখে। নিয়মিত এই
অভ্যাসটি উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের জন্য অত্যন্ত উপকারী এবং এটি ধমনী গুলোকে
পরিষ্কার রেখে এটিকে আরও দুই লাইন বড় কর রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক
রাখে। এরফলে হার্টের ব্লগে তৈরি হওয়ার আশঙ্কা যেমন দূর হয় তেমনি
রক্তনালীতে চর্বি জমতে না পারার কারণে স্ট্রোকের ঝুঁকিও অনেকাংশ কমে
যায়। দীর্ঘমেয়াদী হৃদরোগের হাত থেকে বাঁচতে এবং শরীরকে ভেতর থেকে সুরক্ষিত
রাখতে এই ঘরোয়া পদ্ধতিটি দারুনভাবে কাজ করে।
হলুদ: গোল্ডেন হার্ব বা প্রকৃতির নিজস্ব অ্যান্টিবায়োটিক
হলুদকে বলা হয় বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী আংটি ইনফ্লামেটরি বা ব্যথা নাশক
প্রাকৃতিক উপাদান।ক্যান্সার প্রতিরোধ থেকে শুরু করে ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ানো
সবকিছুতেই হলুদের অবদান অপরিসীম।নিয়মিত হলুদ সেবন শরীরকে ভেতর থেকে জীবাণুমুক্ত
ও সুরক্ষিত রাখে। যে কোন দীর্ঘমেয়াদি রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলুদ
খাওয়া একটি পরিক্ষিত প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির উপায়। হলুদে থাকা কার কেউ
মিন নামক উপাদানটি শরীরের যে কোন পুরনো ইনফেকশন বা হাড়ের জোড়ের ব্যথা দ্রুত
উপশম করতে সাহায্য করে। এটি লিভারের কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে রক্তকে এত চমৎকার
ভাবে পরিষ্কার রাখে যে রোগ বালাই সহজে শরীরকে কাবু করতে পারে না।
হলুদ ভর্তার বিশেষ রেসিপি
দরবার শরীরের যে কোন পুরনো ব্যথায় হলুদ ভর্তা একটি যাদুকরী ঘরোয়া খাবার হিসেবে
কাজ করে।পেঁয়াজ কুচি, রসুন কুচি, শুকনো মরিচ, আদা বাটা এবং হলুদের গোড়া
সরিষার তেলে হালকা করে ভেজে নিন। যতক্ষণ না পানি শুকিয়ে একটু ভাজা ভাজা
হচ্ছে, ততক্ষণ নাড়তে থাকুন এবং সবশেষে নামিয়ে ভর্তা করুন। এই হলুদ
ভর্তা শরীরে অ্যান্টিবায়োটিকের মত কাজ করে, ভাতের ব্যথা কমায় এবং
মাংসপেশির জরতা দূর করে। বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন ধরে পিঠ, কোমর বা
হাঁটুর ব্যথায় ভুগছেন, তাদের জন্য এই গরম ভাতের সাথে হলুদ ভর্তা খাওয়ার
অভ্যাস দারুন উপকারে আসে। এটি শরীরের রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি করে মাংসপেশির
ভেতরের ক্লান্তি ও অবশ ভাব দূর করতেও চমৎকার সাহায্য করে।
হলুদ চা ও হলুদ দুধ
পানিতে এলাচ, তেজপাতা ও লবঙ্গ দিয়ে ফুটিয়ে নিন, এবার এক চিমটি হলুদের
গুড়া দিয়ে তৈরি করুন সুস্বাদু হলুদ চা। এটি ফুসফুসের যে কোন ইনফেকশন বা
সংক্রমণ দূর করতে দারুন সাহায্য করে আবার রাতে ঘুমানোর আগে গরম দুধে হলুদ মিশিয়ে
খেলে শরীরের হাড় মজবুত হয় এবং অনিদ্রার সমস্যা দূর হয়। এই হলুদ দুধ
শরীরের কোষগুলোকে এর রাতারাতি পুনর্গঠন করতে সাহায্য করে। বিশেষ করে ঋতু
পরিবর্তনের সময় যাদের বুকে কফ জমে যায় বা ঘন ঘন শুকনো কাশি হয়, তাদের
শ্বাসনালী পরিষ্কার রাখতে এই পানীয় দুটির জুড়ি নেই। এছাড়া এটি শরীরের
মেটাবলিজম বা হজম প্রক্রিয়াকে উন্নত করে সারাদিনের মানসিক ক্লান্তি দূর করতে
সাহায্য করে।
লিভারের সুরক্ষা ও হজম শক্তিতে তিতা খাবারের গুরুত্ব
তিতা করলার মহিমা
সপ্তাহের অন্তত ১-২ দিন তিতা করলা খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। এটি
রক্ত পরিষ্কার রাখে, শরীরের অতিরিক্ত মেদ কমায় এবং রক্তের শর্করার মাত্রা
বা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখে। নিয়মিত করোলা খেলে ত্বকের নানা রকম
সংক্রমণ ও এলার্জির সমস্যা থেকেও মুক্তি পাওয়া যায়। করলার রস রক্তের
ক্ষতিকর টক্সিন কে ছেঁকে শরীর থেকে বের করে দিতে সাহায্য করে। এছাড়াও এটি
লিভারের কোষগুলোকে পুনর্গঠন করতে এবং পিত্তরসের ক্ষরণ বাড়াতে সাহায্য
করে, যা আমাদের চর্বিযুক্ত খাবার সহজে হজম করতে সাহায্য করে। যারা
কোষ্ঠকাঠিন্য বা ফ্যাটি লিভারের সমস্যায় ভুগছেন, তাদের খাদ্য তালিকায় করলা
রাখা অত্যন্ত জরুরী।
গরমে টক ডাল
গ্রীষ্মের তীব্র গরমে শরীর ঠান্ডা রাখতে মসুর ডালের সাথে কাঁচা আম দিয়ে
রান্না করতে পারেন। তবে এই রান্নার শেষে খাঁটি সরিষার ফোরন দিতে একদম ভুলবেন
না। সরিষার ফোরন আমাদের পরিপাকতন্ত্রকে সচল রাখে, শরীরকে ভিতর থেকে
শীতল করে এবং গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা অনেক কমিয়ে দেয়। এটি গরমের দিনে
শরীরকে ডি হাইড্রেশন বা পানি শূন্যতা থেকে রক্ষা করে। কাঁচা আমের এই টক ডাল
শরীরকে চাঙ্গা করার পাশাপাশি গরমে হিট স্ট্রোকের ঝুমকি অনেক কমিয়ে
দেয়। এটি মুখের সাধ ফিরিয়ে আনে এবং তীব্র গরমে পরিপাকক্রিয়া স্বাভাবিক
রেখে শরীরকে ভেতর থেকে সতেজ ও প্রাণবন্ত রাখতে সাহায্য করে
চিরতার পাতার গুনাগুন
ফল খাওয়ার নিয়ম ও সতর্কতা
ফল যেমন আমাদের শরীরের জন্য উপকারী, ভুল সময়ে বা ভুল উপায় খেলে তা এতে
বিপরীত হতে পারে। প্রতিটি ফল খাওয়ার নিজস্ব কিছু নিয়ম ও সময় রয়েছে যা
মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।অসচেতনভাবে ফল খেলে পেটের নানা রকম জটিলতা দেখা দিতে
পারে। যা শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়। তাই
সঠিক সময়ে ফল খাওয়াও একটি পরোক্ষ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির
উপায়। সেবনের অভ্যাস আমাদের শরীরের ভিটামিন ও মিনারেলসের ঘাটতি পূরণ করে
কোষগুলোকে সঠিক রাখে। উল্টো নিয়মে ফল খেলে তা উপকারের বদলে শরীরে এক
ধরনের ধীর গতির বিষ বা টক্সিন তৈরি করতে পারে যা আমাদের পরিপাকতন্ত্রকে চিরতরে
পঙ্গু করে দেয়।



অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url